একদিন জনৈক পথিক একটি দালানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। দেখল, তিন শ্রমিক একই কাজ করছে: দেয়ালে একটার পর আরেকটা ইট গাঁথছে।
পথিক প্রথম শ্রমিকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন চলছে দিনকাল? কী করছেন?” প্রথম শ্রমিক জবাব দিল, “ভাইরে, জিবনডা শ্যাষ। দেহেন না কী করতাছি! ইট বহাই। জিবনডারে চুইষ্যা নিল। ঠিকমতো টেহাপৈসা পাই না। জিবনডাই বিরিথা। মনে চায়, সাগর পাড়ে গিয়া বইয়া জিরাই, হেইডাই বালা।”
পথিক এগিয়ে গেল দ্বিতীয় শ্রমিকের কাছে। প্রশ্ন করল, “কেমন চলছে দিনকাল? কী করছেন?” দ্বিতীয় শ্রমিক বলল, “এই তো, চলছে ভালই। মসজিদ বানাইতাছি একটা।” তারপর লোকটি আবার কাজে মন দিল।
পথিক তৃতীয় শ্রমিকের কাছে গিয়েও একই কথা বলল, “ভাই জীবনটা কেমন চলছে? কী করছেন?” তৃতীয় শ্রমিক বলল, “আলহামদুলিল্লাহ। আমি একটি সুন্দর ও অসাধারণ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার একটি ঘর বানাচ্ছি, যেখানে শত শত এমনকি হাজারো মানুষ এসে প্রতিদিন নামাজ পড়বেন। আশা করি, এই মসজিদ যতদিন থাকবে, ততদিন আমার রব আমাকে প্রতিদান দিবেন; কারণ আমি তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কাজটি করছি। আমি বড়ই সৌভাগ্যবান, আলহামদুলিল্লাহ। বিশ্বাস করবেন না হয়তো—আমি বিনামূল্যে কাজটি করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে ঠিকই টাকা দিচ্ছে, জানেন?”
তিনজন শ্রমিকই একই কাজ করছে। মজুরিও পাচ্ছে সমান। কিন্তু প্রত্যেকের মনোভাব এবং পৃথিবী ও কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা আলাদা। কেন, জানেন?
এই ‘কেন’টাই উত্তর। আরো স্পষ্ট করে বলি। কেউ যে কাজটি করছে, তা সে কেন করছে—সেটি জানলেই আমরা আমাদের উত্তর পেয়ে যাব।
বেশিরভাগ মানুষই প্রথম শ্রমিকটির মতো। তারা কাজটি কেন করছে, কীভাবে করছে, বা কী উদ্দেশ্যে করছে, তা জানে না। কাজ করতে হয় বলে করে। এমনকি অনেকে আবার এ-ও ভাবে, ইশ্ যদি কাজ করা না লাগত!
কেউ আবার দ্বিতীয় শ্রমিকটির মতো। তারা হয়তো জানে যে, কী কাজটি করছে ও কীভাবে করছে। ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে হয়তো ওপরেও উঠছে তারা। কিন্তু যতক্ষণ না তারা “কেন”র উত্তর পাবে, ততক্ষণ তারা জীবনের অনেক কিছুই হারাতে থাকবে। হয়তো জানতেও পারবে না যে, কী হারালো।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তৃতীয় শ্রমিকের মতো মানুষ জগতে খুবই বিরল। তারা সংখ্যায় হয়তো ১% বা তার চেয়েও কম। তারা শুধু ‘কী’ আর ‘কীভাবে’র উত্তরই জানে না, তারা ‘কেন’ করছে এবং ‘কীজন্য’ করছে তা-ও জানে। তারা তাদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানে। জানে নিজেদের প্রত্যাশাকে। সাধারণ মানুষের সেবা ও সমস্যা সমাধান করার মাধ্যমে তারা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশাকে পরিণত করে সমৃদ্ধি আর প্রাচুর্যের সফলতায়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার প্রতি সচেতনতা সহকারে তারা জীবনকে পরিচালিত করে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ড আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য নিবেদিত। তারা নিজ নিজ গল্পের প্রধান নায়ক। একেকটি প্রকল্পে, একেকটি পাতায়, প্রতিদিন তারা লিখে চলছে নিজেদের গল্প। তাদের রবের জন্য তারা সুন্দর কিছু প্রস্তুত করে নিচ্ছে।
তারা তাদের সুসময় ও দুঃসময় উভয় অবস্থাতেই রবের প্রতি সন্তুষ্ট। আর এজন্য তারা সর্বদাই রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা (শোকর) ও ধৈর্য (সবর) জানায়। ফলে, তাদের রবও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। বিনিময়ে তিনি তাদেরকে দেন ইহকাল ও পরকালে সেরা প্রাপ্তিটুকু। তারাই প্রকৃতপক্ষে সফল।
আপনি কোন শ্রমিকটির মতো হতে চান?
বই: সেভেন স্টেপস টু সাকসেস ইন দীন এন্ড দুনিয়া (অনুবাদ – প্রকাশিতব্য)
লেখক: মারুফ ইউসুফ